ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশে সৌহার্দ ও সম্প্রীতির এক নতুন রাজনীতি শুরু হয়েছে। ভোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াই শেষে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান গতকাল জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গিয়ে সৌহার্দ ও সৌজন্যমূলক রাজনীতির এক অনুকরণীয় উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। দেশের রাজনীতিতে এই প্রথম এমন সৌহার্দ ও শিষ্টাচারের নজির গড়লেন তিনি।
গতকাল সন্ধ্যায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রথমে যান বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় অবস্থিত জামায়াত আমিরের বাসভবনে। এ সময় জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান খুশিমনে ফুলের তোড়া দিয়ে তাঁকে বরণ করে নেন। তিনি বিএনপি চেয়ারম্যানকে মিষ্টিমুখও করান। এরপর দুই নেতা কুশলাদি বিনিময় ও দেশের রাজনীতির সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। এ সময় নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা রোধের আশ্বাস দেন তারেক রহমান। এই আশ্বাসকে সাধুবাদ জানান জামায়াত আমির। এ সময় অন্যদের মধ্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, জামায়াতের নায়েবে আমির আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ও প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের উপস্থিত ছিলেন।
এরপর তারেক রহমান যান এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায়। রাজধানীর বেইলি রোডে (পুরোনো সার্কিট হাউসের পাশে) অবস্থিত নিজ বাসায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ফুলের তোড়া দিয়ে স্বাগত জানান নাহিদ ইসলাম। এরপর তাঁরা কুশলাদি বিনিময় করেন। উভয় নেতা আগামী দিনে দেশ পরিচালনায় নতুন সরকারের কার্যক্রমে কী কী বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন সেসব বিষয়ে আলোচনা করেন। তারেক রহমান তাঁদের নতুন সংসদে গঠনমূলক ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। এ সময় নাহিদ ইসলাম সরকারের যেকোনো ইতিবাচক কাজে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এ সময় বিএনপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন নবী খান সোহেল, ময়মনসিংহ-১০ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামান বাচ্চু, বিএনপি চেয়ারম্যানের প্রেস সচিব সালেহ শিবলী ও দলের মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমন। অন্যদিকে এনসিপির অন্য নেতাদের মধ্যে দলের সদস্যসচিব আখতার হোসেন ও দলের মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম উপস্থিত ছিলেন।
জামায়াত আমিরের স্ট্যাটাস : এদিকে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। এতে তিনি বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অগ্রিম অভিনন্দন জানাচ্ছি। তিনি আজ আমার আবাসিক কার্যালয়ে এসেছিলেন। তাঁর এ আগমন আমাদের জাতীয় রাজনীতির জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আমি তাঁর এ আগমনকে স্বাগত জানাই এবং প্রত্যাশা রাখি- সংলাপ ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে এটি রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার এক নতুন অধ্যায় সূচনা করবে।’ জামায়াত আমির আরও বলেন, ‘আমি এমন এক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখি, যা হবে ফ্যাসিবাদমুক্ত, সার্বভৌম এবং ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত। জামায়াত ১১-দলীয় জোটের সঙ্গে মিলে একটি সমৃদ্ধ, স্থিতিশীল ও আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সাংবিধানিক শাসনের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে।’
ফেসবুক পোস্টে জামায়াত আমির আরও উল্লেখ করেন, ‘আমাদের আলোচনায় তিনি (তারেক রহমান) আশ্বস্ত করেছেন যে, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা এবং বিরোধী দলের কর্মী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যেকোনো হামলা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন। আমি এ আশ্বাসকে সাধুবাদ জানাই। আমাদের প্রত্যাশা, কোনো নাগরিকই যেন ভয়ভীতি বা নিরাপত্তাহীনতার শিকার না হয়।’ বিপরীতে জাতীয় স্বার্থে নির্বাচিত সরকারকে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাসও দেন শফিকুর রহমান। তবে একটি আদর্শিক বিরোধী দল হিসেবে ১১-দলীয় জোট সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে সব সময় আপসহীন থাকবে। তিনি আরও বলেন, সরকারের জনকল্যাণমূলক কাজে আমাদের সমর্থন থাকবে, কিন্তু যেখানেই জবাবদিহির প্রয়োজন হবে, সেখানে আমরা সোচ্চার থাকব। আমাদের উদ্দেশ্য সংঘাত নয় বরং সংশোধন; বাধা দেওয়া নয় বরং পর্যবেক্ষণ। দেশের মানুষ এমন একটি সংসদ প্রত্যাশা করে, যা ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকার রক্ষা করবে এবং স্থিতিশীলতার সঙ্গে রাষ্ট্রকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
সরেজমিন দেখা যায়, গতকাল সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে রাজধানীর বসুন্ধরায় জামায়াত আমিরের আবাসিক কার্যালয়ে এলে বাসার নিচে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অভ্যর্থনা জানান জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। পরে কার্যালয়ে প্রবেশ করলে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। এরপর দুই শীর্ষনেতার বৈঠক শেষে গণমাধ্যমে কথা বলেন দলের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের। এ সময় তিনি বলেন, অতীতে দুই দল একসঙ্গে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করলেও এবারের নির্বাচনে তারা আলাদাভাবে অংশগ্রহণ করেছে। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, সরকার এবং বিরোধী দল সমন্বিতভাবে দেশের কল্যাণমূলক কাজ এবং একটি ‘গঠনমূলক ভবিষ্যৎ’ নিশ্চিত করতে পারবে। তারা একত্রে একটি ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার ব্যাপারে একমত হয়েছেন। তিনি জানান, আলোচনা যেসব বিষয় অগ্রাধিকার পায় সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং মানুষের নিরাপত্তা ইস্যুকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। অর্থনীতি সচল রাখা এবং জনগণের মৌলিক চাহিদা যেমন- খাদ্য ও শিক্ষার দিকে সরকারের নজর দেওয়া। তিনি আরও বলেন, সরকারের ইতিবাচক কাজে তারা সহযোগিতা করবেন, তবে জনস্বার্থবিরোধী কোনো ভূমিকা থাকলে তার প্রতিবাদ করবেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘটা অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ও হামলার বিষয়ে তারা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এবং আশা প্রকাশ করেছেন যে সরকার এ ব্যাপারে কঠোর ভূমিকা পালন করবে।