"কোন মেয়েটাকে ভাল লাগছে বল। তুলে আন, রেপ কর। বাকিটা আমি সামলে নেব।"
পৃথিবীর বহু স্থান বিভিন্ন কারণে বিখ্যাত হয়েছে, কিন্তু ধর্ষণের জন্য বিখ্যাত হয়েছে এমন কোন স্থানের নাম কি কখনো শুনেছেন?
সামান্য কারণে মেয়েদের তুলে নিয়ে ধর্ষণ করা সেখানে ছিলো মামুলি ব্যাপার। বিয়ে বাড়িতে ফুচকা খেতে গিয়ে এক মেয়ে বলেছিলো, ফুচকাটা ভালো হয়নি। ব্যস! মেয়েটিকে উচিত শিক্ষা দিতে ঝাঁপিয়ে পড়লো একদল ছেলে। টেনেহিঁচড়ে মেয়েটিকে পাশের ধান ক্ষেতে নিয়ে গিয়ে গেলো। একদিন নয়, দুই দিন নয়, টানা তিন দিন মেয়েটিকে গণধর্ষণ করলো। তিন দিন পর মেয়েটিকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে তার মাকে বললো, "মেয়েটিকে আমাদের পছন্দ হয়েছে। ওকে সাজিয়ে রেখো। কাল আবার নিয়ে যাব।"
আরেক মহিলা স্বামীর সঙ্গে রিক্সায় চেপে বাপের বাড়ি আসছিলেন, পথে ভাড়া নিয়ে তার স্বামীর সঙ্গে রিক্সাওলার বাদানুবাদ হয়। জানতে পেরে এক দল ছেলে ঐখানে হাজির হয়ে তাদের প্রশ্ন করতে থাকে, তোমরা কি বিবাহিত? বিয়ের কি কোন কাগজপত্র আছে? অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ তুলে মহিলার স্বামীকে বেদম পেটানো হয়, এবং প্রকাশ্য রাস্তায় ফেলে মহিলাকে গণধর্ষণ করে তার গোপনাঙ্গে বরফ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এতেই নরপশুরা ক্ষ্যান্ত হয়নি, তাদের কাছ থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকাও দাবি করে। অনেক অনুনয় বিনয়ের পরে দশ হাজার টাকায় রফা হয়, এবং টাকা দেবার পরে তাদের ছাড়া হয়।
এক বিধবা মহিলা বিপত্নীক এক ব্যক্তিকে বিয়ে করে নতুন জীবনের সূচনা করেছিলেন। পাড়ার ছেলেরা থাকতে বিধবাদের কেনো স্বামী লাগবে! গুণ্ডার দল তাদের বাড়িতে চড়াও হয় এবং অবৈধ সম্পর্কের অভিযোগ এনে স্বামীকে বেঁধে স্ত্রী-র ওপর গণধর্ষণ চালায়। তার পরে তারা পঞ্চাশ হাজার টাকা দাবি করে। দম্পতির কাছে অত টাকা ছিলো না। গুণ্ডারা তখন নজর দেয় তাদের সামান্য একটু জমির ওপর। সেই জমি বিক্রি করে তারা পঞ্চাশ হাজার টাকা দিতে বাধ্য হন। রাগে, দুঃখে, ক্ষোভে, অপমানে কিছু দিন পরেই স্বামীটি মারা যান, বিধবা আবারো বিধবা হন।
গ্রামটির উপর দিয়ে বয়ে গেছে ইছামতী আর যমুনা নদী। এই নদীর পানিতে কত মেয়ের লাশ ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে তার কোন হিসেব নেই। গ্রামের প্রায় বাড়িতে মায়ের সামনে মেয়েকে, মেয়ের সামনে মা কে, বাবার সামনে মেয়েকে, স্বামীর সামনে স্ত্রীকে, ভাইয়ের সামনে বোনকে ধর্ষণের শিকার হতে হয়ছিলো। বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে মাত্র এক ঘন্টা দূরে এবং কলকাতা থেকে আড়াই ঘন্টা দূরে উত্তর চব্বিশ পরগণার একটি গ্রামের নাম সুটিয়া। এই অখ্যাত গ্রামটি এক সময় "ধর্ষণ গ্রাম" হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলো।
অফিসিয়ালি হিসাবে ১৯৯৯-২০০২ এই তিন বছরে সুটিয়াতে ৩৩ টি ধর্ষণ ও ১২ টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। আনঅফিসিয়াল হিসাব আরো কয়েকগুণ বেশি। পুলিশের কাছে ভয়ে কেউ মুখ খোলে না। খুললেই খুন। মৃত্যুর ভয়কে উপেক্ষা করে পুলিশের কাছে গিয়েও লাভ নেই, পুলিশ চলে উপর মহলের আঙ্গুলের ইশারায়। আর উপর মহল থেকেতো বলাই আছে, "কোন মেয়েটাকে ভাল লাগছে বল। তুলে আন, রেপ কর। বাকিটা আমি সামলে নেব।"
প্রতিবছর বর্ষায় গ্রামটি ভেসে যেতো। সরকারি বেসরকারি তহবিল থেকে গ্রামবাসীর জন্য প্রচুর রিলিফ আসতো। আর এই রিলিফ ফান্ডের দখলদারিত্ব নিয়ে সুশান্ত চৌধুরি আর বীরেশ্বর ঢালীর উত্থান। প্রথমদিকে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে তারা সরকারি বেসরকারি রিলিফ বিলি করতো। এর পরে যা হয়, ধীরে ধীরে তারা নিজেরাই সেই সব রিলিফের মাল সরাতে থাকে।
স্থানীয় স্কুল পালানো, কর্মহীন, হতাশ কমবয়েসী ছেলেদের দলে ভিড়িয়ে ক্রমে সুটিয়া এবং আশপাশের সমস্ত গ্রামের রিলিফ সেন্টারের দখল তারা নিয়ে নেয়। তাদের সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয় পুরো এলাকায়। চাঁদাবাজি, জবরদখল, চোরাচালান, মাদক, মুক্তিপণ আাদয় এমন কোন অপরাধ নেই যা তারা করেনি। স্থানীয় ইনফর্মারদের সাহায্যে তারা স্থানীয় পরিবারগুলো সম্বন্ধে খবর জোগাড় করতো, যে পরিবারে সুন্দরী নারীর সংবাদ পেতো বাইকবাহিনী সেখানে হাজির হয়ে গণধর্ষণ করতো।
এদের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে স্থানীয় জনগণ ২০০২ সালের ১ আগস্ট সুটিয়া বাজারে প্রথম প্রকাশ্য এক প্রতিবাদ সভার ডাক দেয়। অনেকেই এসেছে, কিন্তু বক্তৃতা করার সাহস কেউ পাচ্ছে না। বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে? চারদিকে আতঙ্ক আর হতাশার অন্ধকার। সেই অন্ধকারের বুক চিরে এগিয়ে এলেন ত্রিশ বছরের এক যুবক, মাইকটা তুলে নিয়ে বললেন, "যদি এখনও মা-বোনেদের সম্মান রক্ষা করতে না পারি, তা হলে আমরা সভ্য সমাজে থাকার যোগ্য নই। আমাদের যদি ধর্ষণকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস না থাকে, তাহলে আমাদের তাদের থেকেও বেশি শাস্তি পাওয়া উচিত…তাই আসুন, আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে আমাদের নারীদের সম্মান রক্ষা করুন।”
কে এই যুবক? কি তার পরিচয়? মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের অনেকে শরনার্থী হিসেবে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো। যুদ্ধ শেষে এদের কেউ কেউ ভারতে থেকে যায়। জগদীশ বিশ্বাস ও গীতা বিশ্বাসও মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ফরিদপুর থেকে সুটিয়ায় চলে গিয়েছিলেন এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার এক বছর পরে ১৯৭২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তাদের ঘরে বরুণ বিশ্বাসের জন্ম।
বরুণ বিশ্বাস কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি ও নিউ ব্যারাকপুরের বি. টি. কলেজ থেকে বি.এড ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষা শেষে তিনি পশ্চিমবঙ্গ সিভিল সার্ভিস (WBCS) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। চাইলে সরকারি চাকুরী করে আরাম-আয়েশে জীবন কাটিয়ে দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি বেছে নেন সমাজসেবা ও শিক্ষকতার জীবন। মনে পড়ে আরেক বাঙালি সুভাষ চন্দ্র বসুর কথা সমগ্র ভারতবর্ষের আইসিএস পরীক্ষায় চতুর্থস্থান লাভ করেও যিনি ভারতবাসীর মুক্তির জন্য সংগ্রামের পথ বেছে নিয়েছিলেন।
বরুণ বিশ্বাসের হাতে কোন বন্দুক ছিলো না, পাশে প্রশাসন ছিলো না, তার কথা তুলে ধরার জন্য কোন মিডিয়া ছিলো না। তবুও তিনি একা লড়েছিলেন, অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। তার এক ডাকেই সেদিন গর্জে উঠেছিলো কয়েক হাজার মানুষ। জেগে উঠেছিলো একটা নিস্তব্ধ গ্রাম। তার এক আহবানে গ্রামের প্রতিটি মানুষের চাপা ক্ষোভ প্রতিবাদে রূপ নেয়। তৈরি হয় "সুটিয়া গণধর্ষণ প্রতিবাদ মঞ্চ"। শুরু হয় আন্দোলন, চলে প্রতিবাদ। যে মহিলারা বাড়ির বাইরে পা রাখতে ভুলে গিয়েছিলো, দলে দলে তারাও রাস্তায় নেমে এলো।
বরুণ প্রথমে ঐ ধর্ষকদের একটা তালিকা করলেন। তারপর ১৮ টি গাড়ির কনভয় সাজিয়ে এসডিও, এসডিপিও, ওসির নিকট সেই লিস্ট জমা দিয়ে এলেন। খবর পেয়ে রাজ্য মহিলা কমিশনের সদস্যরা গ্রামে এলেন। ধর্ষিতাদের সাথে কথা বলে তারা এলাকার ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির খবর জেনে চমকে গেলেন। মূখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কাছে বরুণ নিজ হাতে চিঠি লিখলেন। প্রশাসন নড়েচড়ে বসলো। সিআইডি তদন্তের পর পুলিশ সুশান্ত চৌধুরি ও বীরেশ্বর ঢালীকে দলবল সহ গ্রেফতার করলো। বিচারে এদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হলো। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো গোটা গ্রাম। বন্ধ হলো ধর্ষণের মহোৎসব। নারীরা ফিরে পেলো প্রাণ।
তার অনেক দিন পর ২০১২ সালের ৫ জুলাই সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটে কলকাতা থেকে ফেরার পথে গোবরডাঙা রেল স্টেশনের বাইরে পার্কিং লটে ১৫-১৬ বছরের এক ছেলে বরুণ বিশ্বাসকে পিছন থেকে গুলি করে। যে ছেলেটা গুলি করেছিলো সেই ছেলেটাই আগের সপ্তাহে চাল-ডাল কেনার জন্য তার কাছ থেকে সাহায্য নিয়েছিলো। মানব সেবায় নিয়োজিত বরুণ বিয়ে করেননি। শিক্ষকতা করে যা উপার্জন করতেন সবটাই মানুষকে দান করে দিতেন।
বরুণের অন্তিম যাত্রায় চল্লিশ হাজার মানুষ অংশ গ্রহণ করেছিলো। অথচ গুলি লাগার পরেও তিনি চল্লিশ মিনিট জীবিত ছিলেন, সময় মতো হাসপাতালে নিলে হয়তো বেঁচে যেতেন। কিন্তু স্টেশনে থাকা একজন মানুষও সাহস কর হাসপাতালে নিয়ে যায়নি। তার মৃত্যুতে সুটিয়ার নারীরা রাগে ক্ষোভে দা, বটি, ঝাড়ু ইত্যাদি নিয়ে পুলিশ ফাঁড়ি অবরোধ করলো মৃতদেহ ছুঁয়ে সবাই শপথ নিলো খুনিদের শাস্তি না দিয়ে এ লড়াই তারা থামাবে না।
বরুণকে নিয়ে ভারতের পত্রিকাগুলোতে কয়েকদিন খুব লেখালেখি হলো। বুদ্ধিজীবীরা টিভিতে টক শো করলেন। তাকে নিয়ে সিনেমাও হয়েছে। তারপর আস্তে আস্তে সবাই ভুলে গেলো, যেভাবে আমরা ভুলে যাচ্ছি শরিফ ওসমান বিন হাদিকে।
যে ছেলেটা গুলি করেছিলো আাদালতে সে বলেছে, সুশান্ত চৌধুরীর নির্দেশেই সে খুন করেছে। কোন আসামি যদি জেলে বসে যদি কাউকে হত্যার পরিকল্পনা করতে পারে, তাহলে নিশ্চয়ই তার পেছনে রাজনৈতিক দল এবং প্রশাসনের হাত রয়েছে। বরুণ হত্যার আসামী সুশান্ত চৌধুরী জেলেই মারা যায়। আর মাষ্টারমাইন্ড আজও ধরাছোঁয়ার বাইরে।
ইছামতী ও যমুনা নদীর কারণে সুটিয়া বনগাঁ, স্বরূপনগর ও গাইঘাটা অঞ্চলে বন্যা হতো। বন্যা নিবারনের জন্য বরুণ সরকারের কাছে একটি খাল খননের দাবি তোলেন। বরুণ বিশ্বাস খালের একটি নকশাও তৈরি করেন। শেষ পর্যন্ত সরকার খাল খননের দাবি মেনে নিয়ে ৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করে। বরুণের পরিবারের দাবি, খাল খননের টাকা আত্মসাৎ করার জন্যই তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের নির্দেশে বরুণ বিশ্বাসকে খুন করা হয়। বরুণ বিশ্বাস হত্যার মামলার আজও কোন সুরাহা হয়নি। উল্টো বরুণের পরিবারকে জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের দায়ের করা তিন কোটি টাকা মানহানী মামলার ঘানি টানতে হচ্ছে।
ধর্ষক শুধু নারীকে ধর্ষণ করে, আর দূর্নীতিবাজ ধর্ষণ করে পুরো জাতিকে। ধর্ষণ প্রতিরোধ করা সম্ভব হলেও দূর্নীতি দমন সম্ভব নয়। ধর্ষকের বিরুদ্ধে কথা বলে পার পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু দূর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে বলতে গেলেই সর্বনাশ। কারণ দূর্নীতিবাজদের ধর্ষণের ফলে প্রচুর ঘিলু হীন মাথামোটার জন্ম হয় যারা প্রিয় অভিভাবকের জন্য জীবন দিতেও পারে, নিতেও পারে।
লেখক- সাইদুর রহমান
কলামিস্ট